দেশের কৃষি অর্থনীতির একটি বড় চ্যালেঞ্জ এখনো ডাল ও ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণে আমদানিনির্ভরতা। অথচ দেশের বিপুল কৃষিজমি, কৃষকের অভিজ্ঞতা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) বাস্তবায়ন করছে ‘ডাল ও তৈলবীজ উৎপাদনের মাধ্যমে টেকসই পুষ্টি নিরাপত্তা জোরদারকরণ প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়)’।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির লক্ষ্য শুধু বীজ উৎপাদন নয়; বরং উন্নত জাতের বীজ উৎপাদন, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং কৃষকের হাতে পৌঁছে দিয়ে একটি সমন্বিত উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলা। প্রকল্পের আওতায় ১৮ হাজার মেট্রিক টন গুণগত মানসম্পন্ন ডাল ও তৈলবীজ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংখ্যার ভেতরেই লুকিয়ে আছে প্রকল্পের সাফল্যের চিত্র
প্রকল্পের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে এর মাঠপর্যায়ের অগ্রগতির একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। ওই অর্থবছরে চুক্তিবদ্ধ কৃষকদের মাধ্যমে উৎপাদিত হয়েছে ৩ হাজার ৭২৩ দশমিক ১১২ মেট্রিক টন গুণগত মানসম্পন্ন ডাল ও তৈলবীজ। এর মধ্যে ডালবীজ ১ হাজার ৯১৫ দশমিক ৯৩১ মেট্রিক টন এবং তৈলবীজ ১ হাজার ৮০৯ দশমিক ১৮১ মেট্রিক টন।
এই বীজ শুধু গুদামে সংরক্ষিত থাকার জন্য নয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এসব বীজ কৃষকদের মধ্যে বিতরণের মাধ্যমে প্রায় ৬ লাখ একরের বেশি জমিতে চাষাবাদের সুযোগ তৈরি হবে বলে প্রকল্পের হিসাব বলছে।
এখানেই প্রকল্পটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। হিসাব অনুযায়ী, এসব উন্নতমানের বীজ ব্যবহার করে প্রায় ২ লাখ ৫৭ হাজার ২৭৫ মেট্রিক টন ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২ হাজার ৯৮৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
শুধু উৎপাদন নয়, উন্নতমানের বীজ ব্যবহারে ফলন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। প্রকল্পের হিসাবে এর ফলে অতিরিক্ত প্রায় ৫১ হাজার ৪৫৫ মেট্রিক টন ফসল উৎপাদিত হতে পারে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫৯৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
অর্থাৎ হিসাবের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে অতিরিক্ত উৎপাদনের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ নতুন অর্থনৈতিক মূল্য যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
৪২ জেলা ও ২০০ উপজেলায় মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম
প্রকল্পের কার্যক্রম বর্তমানে দেশের ৮টি বিভাগের ৪২টি জেলা, দুটি সিটি কর্পোরেশন এবং ২০০টি উপজেলায় বিস্তৃত। তিনটি ডাল ও তৈলবীজ খামার, তিনটি বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র এবং ১২টি চুক্তিবদ্ধ চাষী কেন্দ্রের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে কার্যক্রম।
এখানে প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চুক্তিবদ্ধ কৃষক ব্যবস্থাপনা। এর মাধ্যমে শুধু বীজ উৎপাদন নয়, কৃষকের সঙ্গে বিএডিসির একটি কার্যকর উৎপাদন-সংযোগ তৈরি হচ্ছে। উন্নত বীজ উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরবর্তী বিতরণ—পুরো প্রক্রিয়াকে একই কাঠামোর আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
নেতৃত্বে ড. মো. শফিকুল ইসলাম
এই বিস্তৃত কার্যক্রমের সমন্বয়ের দায়িত্বে রয়েছেন প্রকল্প পরিচালক ড. মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট বিএডিসির ডাল ও তৈলবীজ বিভাগে যোগ দেন।
প্রকল্পের নথি ও কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরুতেই ডিপিপি প্রণয়ন, পিইসি সভা এবং একনেক অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ধাপ অতিক্রম করতে হয়েছে। এরপর মাঠপর্যায়ে প্রকল্পের কার্যক্রমকে বাস্তব উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
ড. শফিকুল ইসলামের দায়িত্বকালীন সময়ে পরিকল্পনা, মাঠপর্যায়ের সমন্বয়, চুক্তিবদ্ধ কৃষক সম্পৃক্তকরণ, বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
নিয়মিত মাঠপরিদর্শন, উৎপাদনসংক্রান্ত সমস্যা দ্রুত শনাক্তকরণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কৃষকদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রকল্পের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও সংশ্লিষ্টদের কাছে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কম উন্নয়ন ব্যয়ে বড় ফলনের প্রত্যাশা
প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ২৬৫ কোটি ৭৮ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রশাসনিক ও রাজস্ব খাতে ২৩৯ কোটি ৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকা এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে ২৩ কোটি ৯৮ লাখ ৬২ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকল্পের আওতায় ব্যয় হয়েছে ৬৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।
প্রকল্পের আর্থিক কাঠামো বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট—উন্নয়নমূলক অবকাঠামোর পাশাপাশি বড় ধরনের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মাঠপর্যায়ের উৎপাদন, কৃষক সম্পৃক্ততা এবং বীজ বিতরণ ব্যবস্থাকে। ফলে প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু অর্থ ব্যয়ের ওপর নয়; বরং উৎপাদিত বীজ কতটা কার্যকরভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছায় এবং তা ব্যবহার করে কতটা বাড়তি উৎপাদন সম্ভব হয় তার ওপর।
জিয়াউর রহমানের কৃষিভিত্তিক স্বনির্ভরতার ভাবনা থেকে বর্তমান বাস্তবতা
বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে স্বনির্ভরতা অর্জনের ধারণা দীর্ঘদিনের। রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের সময় কৃষিকে উৎপাদনমুখী ও স্বনির্ভর অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে গুরুত্ব দেওয়ার যে ধারার কথা বলা হয়, তার সঙ্গে বর্তমান সময়ে উন্নত বীজ, প্রযুক্তি ও কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগের একটি নীতিগত যোগসূত্র রয়েছে।
বর্তমান সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের আলোকে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার যে প্রত্যাশা তুলে ধরা হচ্ছে, ডাল ও তৈলবীজের মতো আমদানিনির্ভর পণ্যের দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে।
তবে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পাশাপাশি প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য পরিমাপ করতে হবে মাঠের ফলন, কৃষকের আয়, উৎপাদন ব্যয়, বীজের গুণগত মান এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমার বাস্তব ফলাফলের মাধ্যমে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে
প্রকল্পের সম্ভাবনা বড় হলেও বাস্তবায়নের পথে চ্যালেঞ্জও কম নয়। উন্নত বীজ উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, সংরক্ষণে গুণগত মান ধরে রাখা, সময়মতো কৃষকের কাছে বীজ পৌঁছে দেওয়া এবং মাঠপর্যায়ে কৃষকদের যথাযথ প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে উৎপাদিত বীজের মান নিয়ন্ত্রণ এবং প্রকল্পের আর্থিক ও ভৌত অগ্রগতির নিয়মিত মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে পারলে প্রত্যাশিত সুফল আরও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে বিএডিসির দ্বিতীয় পর্যায়ের এই প্রকল্প এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ৩ হাজার ৭২৩ মেট্রিক টনের বেশি বীজ উৎপাদন থেকে কয়েক লাখ একর জমিতে সম্ভাব্য চাষ এবং শত শত কোটি টাকার অতিরিক্ত উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এই সম্ভাবনাকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন ধারাবাহিক মাঠপর্যায়ের তদারকি, মানসম্মত বীজ, কৃষকবান্ধব বিতরণ ব্যবস্থা এবং কঠোর জবাবদিহিতা। এসব ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালক ড. মো. শফিকুল ইসলামের নেতৃত্ব ও সমন্বয় কতটা কার্যকর হয়, সেটিই আগামী কয়েক বছরে প্রকল্পটির প্রকৃত সাফল্যের অন্যতম মাপকাঠি হবে।
ডাল ও তৈলবীজ উৎপাদন বাড়াতে পারলে এর সুফল শুধু কৃষকের মাঠে সীমাবদ্ধ থাকবে না; খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, কৃষকের আয়, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে। সেই বিবেচনায় বিএডিসির এই প্রকল্প দেশের কৃষি খাতে একটি সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
Copyright © 2026 সত্যযুগ. All rights reserved.