ঢাকা মেডিকেলের কথা শোনেনি এমন লোক হয়তো বাংলাদেশে খুব কমই পাওয়া যাবে।পুরো নাম হচ্ছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ। সংক্ষেপে ঢামেক অথবা ডিএমসি। এটি রাজধানী ঢাকার সেক্রেটারিয়েট্ রোডে অবস্থিত। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ১৯৪৬ সালের ১০ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয়। চিকিৎসা সেবায় ঢাকা মেডিকেলের অনেক সুনাম আছে। প্রতিবছর এখান থেকে চিকিৎসা শাস্ত্রে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করে অনেক চিকিৎসক চিকিৎসা সেবায় আত্মনিয়োগ করেন।আমি ঢাকাতে নিয়মিত প্রায় ১৫ বছর যাবত বসবাস করছি। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা নেওয়ার মতো সময় সুযোগ তেমন হয় নাই। হঠাৎ করে ফুড পয়জনিং এর কারণে ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা নিতে গেলাম খুব সকালে। রিকশা থেকে নামার পর কিছু লোক ঘিরে ধরে বিভিন্ন কথা জিজ্ঞেস করল।অবশ্য এদের ব্যাপারে আমার সম্মুখ কিছু ধারণাও আছে। অনেকে এদেরকে আবার রাগে ক্ষোভে দালালও বলে। যথারীতি ১০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে ইমারজেন্সিতে ডাক্তার দেখালাম। তিনি সমস্যার কথা শুনে ২১৭ নং ওয়ার্ডে পাঠালেন।যেতে দেখলাম পথে রোগী পাশে রোগী খাটে রোগী নিচে রোগী যেখানে সেখানে রোগী। পেটে প্রচন্ড ব্যথা নিয়ে কষ্ট সহ্য করে হেঁটে দ্বিতীয় তলায় ২১৭ নং ওয়ার্ডে গেলাম, দেখি কোন ডাক্তার নাই নার্স নাই। একজন ফ্লোর মুছতেছে তিনি চেচিয়ে উঠে বললেন," এদিকে আসবেন না দেখেন না মুছতেছি" আমি বললাম ডাক্তার এখানে পাঠিয়েছে। ফ্লোর ক্লিনার বললেন" কোন ডাক্তার পাঠিয়েছে? আজ এখানে কোন এডমিশন হবে না। আজ বন্ধ। ২১৯ এ ডাক্তার আছে ওখানে দেখান।" যথারীতি ২১৯ এ ডাক্তার দেখালাম।উনি পাঠালেন ২২০ নং ওয়ার্ডে।পেটে ব্যথা ও যন্ত্রণা নিয়ে ২২০ নং ওয়ার্ডে গেলাম। ৮.৩০ বাজে কোন ডাক্তার নার্স কেউ নাই। একজনকে জিজ্ঞেস করতে তিনি বললেন, ওয়েট করেন এখনই চলে আসবে। কিছুক্ষণ পরে একজন নার্সকে পেলাম তাকে সমস্যার কথা বলতে বলল,ওয়েট করেন ডাক্তার আসবে। ডাক্তার এসে মোবাইলে কি যেন দেখতেছে। এমন সময় আমি টিকিট দেখিয়ে বললাম পেটে প্রচন্ড ব্যথা রাত তিনটা থেকে মোটে কমতেছে না। সমস্যার কথা শুনে উনি অমিপ্রাজল ও টাইমনিয়াম মিথাইল সালফেট ইঞ্জেকশন লিখে দিলেন সাথে টেস্ট। সিস্টারের কাছে বলেন উনি আপনাকে দিয়ে দিবে। সিস্টারকে দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে বললেন, এগুলো আমাদের কাছে নাই কিনে আনতে হবে। আমাদের গুলো শেষ হয়ে গেছে। পাশ থেকে একজন (সম্ভবত রোগী) বললেন, "থাকবে কি করে সবই তো বিক্রি করে খেয়ে ফেলেছে।" পেট ব্যথা নিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে ওষুধ আনতে যাওয়ার মত শক্তি-সামর্থ্য বা ইচ্ছা তখন আমার ছিল না। অগত্য আমার শাশুড়ি যেয়ে বাইরে অবস্থিত ফার্মেসি থেকে ওষুধগুলো নিয়ে আসেন। তিনিও মাজায় ব্যাথার কারণে ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না। নার্স ওষুধ গুলো ইনজেকশনের মাধ্যমে আমার হাতের শিরার মধ্যে দেওয়ার ব্যবস্থা করতেছে। জুনিয়র নার্স পারবে না বলে সিনিয়র নার্স এসে দু তিনবার হাতে সুচ ফোটালেন ও এদিক সেদিক করতে করতে সেরা পেয়ে গেলেন ও ইনজেকশন প্রয়োগ করলেন। টেস্ট হিসেবে ডাক্তার আমাকে আলট্রাসনোগ্রাফি করতে বলেছেন। যথারীতি গেলাম আল্ট্রাসনোগ্রাফি করতে প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে নিচে ব্যাংকে টাকা জমা দিতে গেলাম। ২২০ টাকা ওনাকে ভাঙতি দিতে হবে। পেটে ব্যথায় তখনও আমি কাতরাচ্ছি। ব্যাংকারকে রিকুয়েস্ট করে বললাম ভাই ৫০০ টাকা আছে আপনি একটু খুচরা করে নেন। তিনি চেচিয়ে বললেন, আমি দিতে পারবো না। যেখান থেকে পারেন খুচরা করে নিয়ে আসেন।" কড়া গলায় কথাগুলো বলে অন্য রোগীকে সময় দিলেন। টাকা জমা দিয়ে আবার প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে আলট্রাসনোগ্রাফি রুমের কাছে এলাম। তখন প্রায় বারোটা বাজে। এখনো আলট্রাসনোগ্রাফি ডাক্তার আসেন নাই। দেখলাম আমার মত আরও রোগী সবাই অপেক্ষা করছে।আমি সবার আগে প্রেসক্রিপশন জমা দিলাম। দেখি আমার আগে আরো দুই তিনজন রোগী আল্ট্রাসনোগ্রাফি রুমে ঢুকলেন, জিজ্ঞাস করতে তারা বললেন, এগুলো রাত্রে সিরিয়াল দেওয়া। বেশ ভালো কথা,এবার দেখি এক জন আর একজন রোগী কে সঙ্গে নিয়ে আসছেন আর বলছেন খুবই ইমার্জেন্সি এনাকে আগে করে দেন। একের পর এক ওনাদের রোগী গুলোই করে যাচ্ছেন। আমি পেটের যন্ত্রণা নিয়ে তখনো অপেক্ষা করছি। সকালে আসা এক রোগীর স্বজন রাগান্বিত হয়ে বললেন, এই যে ভাই আপনি গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন আপনি কি করেন? উনি বললেন, আমি স্টাফ। রোগীর স্বজন বললেন, আপনার কার্ড কই? পরিচিতি নাম্বার কই? তখন কথিত স্টাফ কিছুই দেখাতে পারলেন না। পরে জানা গেল উনি একজন দালাল। ডিউটি রত আনসার ও সিরিয়াল লেখা আপুর সঙ্গে যোগ সাজোক করে রোগীকে আগে সিরিয়াল পাইয়ে দেন। একজন অভিযোগ করে বললেন, "এখানে আনসার থেকে আয়া সবাই অবৈধ আয়ের সঙ্গে যুক্ত। এরা সিন্ডিকেট করে রোগীকে জিম্মি করে বাড়তি উপার্জন করে। যেটা সম্পূর্ণ অবৈধ।" এবার এলো আমার পালা। জিজ্ঞাস করা হলো আপনার প্রসবের চাপ আছে? আমি বললাম, আছে। আপনার মাস্ক আছে? আমি বললাম মাস্ক নাই। সিরিয়াল লেখা আপু ও আনসার বললেন, মাস্ক ছাড়া ভিতরে ঢোকা যাবেনা।আপনি বাইরে থেকে মাক্স নিয়ে আসেন। মাস্ক আনতে আনতে আরও তিনজন রোগীকে আল্ট্রাসনোগ্রাফি রুমে ঢুকানো হল। যথারীতি আমার আলট্রাসনোগ্রাফি করার পরে ওয়েট করতে লাগলাম।পরবর্তীতে রিপোর্ট নিয়ে ২২০ নং ওয়ার্ডে ডাক্তারকে দেখালাম। তিনি রিপোর্ট দেখে রেফার্ড করে দিলেন মেডিসিন বিভাগে। আবার অসুস্থ শরীর নিয়ে হেঁটে নতুন ভবন আট তলায় মেডিসিন বিভাগে গেলাম। একজন ডাক্তার আমাকে দেখে বিভিন্নভাবে শারীরিক পর্যবেক্ষণ করছেন প্রেসার দেখছেন রোগের ইতিহাস শুনছেন। তাকে খুব ভালো একজন ডাক্তার মনে হলো। খুবই সহানুভূতিশীল একজন মহিলা ডাক্তার।তিনি সব কিছু শুনে আমাকে তিনটি এক্সরে করতে দিলেন এবং পরামর্শ দিলেন মহাখালী গ্যাস্ট্রো লিভার হাসপাতালে রিপোর্টটি দেখাতে। ভদ্রমহিলা ডাক্তারের কথা শুনে এক্সরে করার জন্য দুই তলায় ব্যাংকে টাকা জমা দিতে গেলাম। তখন বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে। দেখলাম বিশাল লাইন। সকাল ও দুপুর না খাওয়া শরীরে আর লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগছেনা। আসলে পেটে ব্যথার কারণে খাওয়ার রুচি নাই। তাই এক্সরে না করেই প্রেসক্রিপশনে লেখা ওষুধ কিনে বাসায় উদ্দেশ্যে রিকশায় উঠলাম। তখন সবে সন্ধ্যে।
<span;> বিশেষ দ্রষ্টব্য আমার রোগটাও কিন্তু ইমার্জেন্সি ছিল। চিকিৎসা নিতে সকাল থেকে সন্ধ্যা। এভাবে প্রতিনিয়ত ঢাকা মেডিকেল কলেজে আসে অনেকে ইমার্জেন্সি রোগী। অনেকের সাথে হয়তো কেউ থাকেও না। তারাই হয়তো হতভাগা হতভাগিনী! ইমার্জেন্সি চিকিৎসা পেতে পেতে হয়তো এক সময় লাশ হয়ে যেতে হয়। তার বাঁচার কথা থাকলেও চিকিৎসার অভাবে লাশ হয়ে ফিরে যেতে হয়। কথাগুলো নির্মম হলেও বাস্তব।
Copyright © 2026 সত্যযুগ. All rights reserved.